সোমবার, ২৩ মার্চ ২০২৬

সেলিনা হোসেনের ছোটগল্পঃ নরনারী সম্পর্ক

নাজিয়া আফরিন

মানব সৃষ্টির রহস্যের মূলে রয়েছে নর-নারীর শারীরিক সম্পর্ক। পৃথিবী এত

- Advertisement -

সুন্দর অথবা এত জটিল হয়ে ওঠার জন্য যে বিষয়টি সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য এবং গুরুত্ব বহন

- Advertisement -shukee

করে তা হলো এই নর-নারী। নরের অংশ নরের এবং নারীর অংশ নারীর। নরের প্রাপ্যও

নরের নারীর প্রাপ্যও নারীর। এই সহজ সত্যটুকু যদি সহজভাবে জীবনকে সরল রেখায়

চালিত করতে পারতো, তাহলে হয়তো আজকের সমাজে আর নারীবাদ পুরুষবাদ নিয়ে

এতো বাক-বিতণ্ডার আবশ্যক হতো না। কিন্তু জীবন কখনো সরল রেখায় চলায় আনন্দ

পায় না। তাইতো নারী-পুরুষের সম্মিলনে তৈরি হয়েছে আরেকটি জটিল চক্র। যে চক্রে

আছে পাওয়া, না পাওয়া, আছে হতাশা, তিক্ততা আবার আছে একটুখানি পাওয়ার আনন্দে

সকল দুঃখ কষ্ট আর গ্লানি ভুলে যাওয়ার তৃপ্তি। এসকল তাত্ত্বিক, দার্শনিক বা অভিজ্ঞতার

কথা সেলিনা হোসেনের ছোটগল্পের অলংকার। আর এসব অলংকারের যথার্থ বিন্যস্ত করে

পাঠকের জন্য পসরা সাজানো হয়েছে এ অধ্যায়ে। কার্ল মার্ক্স এর নর-নারী সম্পর্কের সূত্র

ব্যাখ্যায় অনুপ্রাণিত সেলিনা হোসেন তাঁর গল্প নির্মাণে সর্বাধিক মনোযোগ নিবিষ্ট করেছেন

নর-নারীর চরিত্র বিশ্লেষণে। জীবনের গোলক ধাঁধায় পড়ে সম্পর্কগুলো কীভাবে খাবি

খাচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছে আক্রোশ আর স্বার্থের চোরাবালিতে তা সেলিনা হোসেন নিবিড়

পর্যবেক্ষণ থেকে তুলে ধরেছেন। এ প্রবন্ধে নর-নারী সবচেয়ে জটিল এবং পাক খাওয়া

জীবনের সন্ধান পাওয়া যায়। সম্পর্কের সূত্রে নর এবং নারীর ভূমিকার নিরাসক্ত বর্ণনা

রয়েছে সেলিনা হোসেনের প্রায় অধিকাংশ গল্পে। স্বার্থের মোহে নর-নারীর সবচেয়ে

আকর্ষিত সম্পর্কেও চলে টানাপোড়েন। মধুরতা, তিক্ততার বয়ানে সেলিনা হোসেন প্রতিটি

নর-নারীর চরিত্রকেই দিয়েছেন সজীবতা। নারী সর্বাধিক জটিলতার মুখোমুখি হয় পুরুষের

সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে। এ জটিলতার পাক থেকে পাঠককে মুক্তি দিয়েছেন সেলিনা হোসেন।

সেলিনা হোসেনের সেই বিশ্লেষণী নিবিড় পর্যবেক্ষণ পাঠকের সামনে তুলে ধরার প্রয়াস

রয়েছে এ প্রবন্ধে।

মানুষ সমাজবদ্ধ জীব। শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে তার পক্ষে অনেক কিছুই করা সম্ভব। সেই সম্ভবের

মধ্যে কারো কারো ইচ্ছা একা থাকা। সেই একা থাকা অবশ্য ক্ষণকালের জন্য। আমাদের

আদি পুরুষ হযরত আদম (আ.) কে সৃষ্টি করে বেহেশতে থাকতে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু

বেহেশতের অমৃত সুধা আর সুখ বিলাসিতার মধ্যে থেকেও তিনি একা থাকতে পারেননি। তার

একাকীত্ব ঘোচানোর জন্য হযরত হাওয়া (আ.) কে সৃষ্টি করা হয়। সুতরাং বুঝা যায় যে একজন

সঙ্গীর সাহচর্য স্বর্গ সুখের ঊর্ধ্বে। হযরত আদম (আ.) এর সময় থেকে অর্থাৎ মানব সৃষ্টির শুরু

থেকে নর-নারী তথা মানব-মানবীর সম্পর্ক ছিল এবং তা যুগ থেকে যুগে সেই সম্পর্কের বিস্তার

লাভ করেছে।

ইতিহাস পর্যালোচনায় জানা যায় নারী-পুরুষ আর্থনীতিকভাবে উভয়েই স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল। তখন

কারো প্রতি কোনো দায় ছিল না। ক্রমে যখন শ্রমবিভাজন, জাতি বৈষম্য দেখা দিল তখন

সম্পত্তি ব্যক্তি মালিকানাধীন হতে থাকে। তারচেয়ে বড় কথা নারী-পুরুষের এ দৈহিক সংস্পর্শে

সন্তান জন্ম নিলে সন্তানের পিতৃ পরিচয় অজ্ঞাত রয়ে যাচ্ছে। তাতেও পুরুষের মাথা ব্যথা ছিল

না। অর্থ সম্পদের মালিকানার প্রশ্নে উত্তরাধিকারের প্রয়োজনে পুরুষ সন্তানের পিতৃত্বের দাবি

নিয়ে ভাবতে শুরু করে। তখন একজন পুরুষের একজন নির্দিষ্ট নারী অর্থাৎ বিয়ের ধারণা লাভ

করে। বিয়ের মাধ্যমে সংসারের সূচনা হয়।

নর-নারীর এই সম্পর্ককে সেই প্রাচীনকালের সাহিত্য চর্যাপদ থেকে সাহিত্যে স্থান পেতে দেখা

যায়। ২ নম্বর চর্যাপদে কুক্কুরিপাদানাম বলেছেন‘দিবসহি বহূড়ী কাউহি ডর ভাই

রাতি ভইলে কামরু জাই।’

সমাজে সকলের ভয়ে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে থাকা বউটিও রাত হলে যৌনতৃষ্ণা নিবৃত করতে

অভিসারে যায়। তাই কামতৃষ্ণাকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। আর এই কাম তৃষ্ণার

আকর্ষণেই একজন নারী ও পুরুষ কাছাকাছি আসে। নর-নারীর এই দৈহিক মেলামেশাকে ভিত্তি

করেই তারা অবাধে ব্যভিচারে লিপ্ত হয়। আর এসব অবাধ মেলামেশার কথা বেশ

খোলাখোলিভাবে আমাদের সাহিত্যে প্রবেশ করেছে।

আধুনিক উপন্যাসে অবাধ মেলামেশাকে ঔপন্যাসিকদের অনুমোদন লাভ করতে দেখা যায়।

মধ্যযুগের সকল সমাজেই নরনারীর অবাধ যৌন মিলনের নানা প্রকার সামাজিক ও নৈতিক বাধা

ছিল। আধুনিক যুগের ইউরোপীয় সমাজে এ বাধা অপসারিত হয়েছে এবং বর্তমান যুগে

যৌবনপ্রাপ্ত নরনারীর অবাধ যৌন মিলনকে মানব জীবনের স্বাভাবিক বৃত্তি বলে মনে করা হয়।

বাঙালি মুসলিম সমাজ এ বিষয়ে যদিও অতটা অগ্রসর হয়নি, তথাপি বস্তুবাদি সাহিত্যিকগণ

নরনারীর অবাধ মেলামেশাকেই অনুমোদন দিয়ে থাকেন।

তবে সাহিত্যিকগণ শুধু অবাধ

মেলামেশাকেই নয়, তুলে ধরেছেন দৈহিক আকর্ষণে নারীকে চিরকাল কাছে পাওয়ার

বাসনাকেও। কাহ্ন পাদানাম ১০ নম্বর পদাবলিতে লিখেছেন, ‘আলো ডোম্বি তোএ সম করিব মই

সাঙ্গ/ নিঘিণ কাহ্ন কাপালি জোই লাঙ্গ।’ তারপর মধ্যযুগের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যেও নর-নারীর

জৈবিক সম্পর্কের ব্যাপক উল্লেখ রয়েছে। নৌকা খণ্ডে রাধাকে নৌকা পারাপার করতে রাধাকে

দিয়ে কৃষ্ণের রতি-ক্রিয়া করার অঙ্গীকার করিয়ে নিতে দেখা যায়। ‘সরস বচন করি মান শৃঙ্গার

বচন আহ্মার পাল এ।’জৈবিক প্রয়োজন থেকে নর-নারী সম্পর্কের সূত্রপাত হলেও বর্তমানে

সেই সম্পর্ক বহূমাত্রিক সম্প্রসারণ ঘটেছে। সেই সম্পর্কগুলো স্বামী-স্ত্রী, ভাই-বোন, মাতা-পুত্র,

পিতা-কন্যা এবং সাধারণ নর-নারী। প্রতিটি সম্পর্কের দৃষ্টিকোণ স্বতন্ত্র। আমাদের

সাহিত্যাঙ্গনের কলা-কুশলীগণ সেই সম্পর্কগুলোকে চমৎকার সূত্রে আবদ্ধ করে তার ব্যাখ্যা

করেছেন মনোজ্ঞ বর্ণনায়।

মধ্যযুগের দেব-দেবী নির্ভর সাহিত্য যখন পাঠক সাধারণের একঘেঁয়েমির কারণ হয়ে ওঠছিল

তখন সাহিত্যিকগণ সর্বপ্রথম সূচনা করলেন সাহিত্যে মানুষের কথা বলা। মানুষের কথা বলতে

গিয়ে তাঁরা প্রথম আশ্রয় করলেন মানুষের কল্পনাপ্রবণতাকে। অর্থাৎ রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান।

সেখানে তারা দেখাতে চাইলেন জৈবিক আকর্ষণে কাছে আসা দুটি নর-নারীকে। ক্রমে সেই

সাহিত্য সাধারণ জন মানুষের কথা হয়ে ওঠে। দৌলত উজির বাহরাম খাঁন, কোরেশী মাগন

ঠাকুর, কায়কোবাদ সহ আরো অনেক কবি সাহিত্যিকগণের সৃষ্টি মানব-মানবীরা আজ বিশ্ব

সাহিত্যে স্থান পেয়েছে। তার ধারাবাহিকতা আধুনিক যুগের খ্যাতিমান সাহিত্যিকদের দ্বারা

নর-নারী সম্পর্ক

প্রসার লাভ করেছে। সেই খ্যাতিমান সাহিত্যিকদের মধ্যে সেলিনা হোসেন অন্যতম। তাঁর সৃষ্টি

মানব-মানবীরা আমাদের চারপাশের জগত থেকে নেয়া বাস্তবতার কষাঘাতে জর্জরিত। ষাটের

দশকে সেলিনা হোসেনের লেখালেখির সূচনা লগ্ন থেকেই তিনি একজন সমাজ সচেতন লেখক।

বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি প্রচুর সাহিত্যগ্রন্থ পড়েছেন। নামজাদা লেখকদের চিন্তাপ্রসূত

উচ্চারণগুলোকে তিনি ব্যাপকভাবে গ্রহণ করেছেন। তেমনি মার্ক্স-এঙ্গেলসের রচনা পড়েই তিনি

নর-নারী সম্পর্কের সূত্র ব্যাখ্যা করার চিন্তা তাঁর মাথায় আসে।

তাছাড়া তাঁর বাল্যে যখন

যেভাবে সুযোগ হয়েছে সাধারণ মানুষের কাছাকাছি এসেছেন, তাদের সুখ-দুঃখ প্রত্যক্ষ

করেছেন এবং সমৃদ্ধ করেছেন তাঁর মানব-মানবীর সম্পর্কের সঞ্চয়। তিনি বলেন তখন আমরা বগুড়ায় থাকতাম। বাবা চাকরিজীবী ছিলেন। গরীব-দুখীদের সাহায্যের জন্য

হোমিওপ্যাথির চর্চা করতেন। আমি তাকে পুরিয়া বানিয়ে দিয়ে সাহায্য করতাম। সে সময়

দেখেছি নানা রকম মানুষ তার কাছে আসতো। তারা অনেক গল্প করতো, মন দিয়ে

শুনতাম। এই গল্পগুলো আমার মানব-মানবীর সম্পর্কের সেরা সঞ্চয়।

তারপর তিনি তাঁর ব্যক্তিজীবনে দেখা এবং বুঝার সম্পর্কগুলোকে গল্পে সাজালেন নিম্নরূপে:

১. স্বামী-স্ত্রী রূপে নর-নারীর চিত্রায়ণ

২. ভাই-বোন হিসেবে নর-নারীর চিত্র

৩. পিতা-কন্যা সম্পর্কের সূত্রে নর-নারী

৪. মাতা-পূত্রের ভূমিকায় নর-নারীর উপস্থিতি

স্বামী-স্ত্রী রূপে নর-নারীর চিত্রায়ণ

নারী-পুরুষের জৈবিক আকর্ষণে সৃষ্ট পবিত্র এবং সর্বজন স্বীকৃত যে সম্পর্ক তৈরি হয় তার নাম

স্বামী-স্ত্রী। সৃষ্টির আদিকাল থেকে নারী-পুরুষ দৈহিক আকর্ষণে একে অন্যকে কাছে পেয়েছে ও

গর্ভে সন্তানও ধারণ করেছে। তবে এ সম্পর্কের না ছিল কোনো নাম, না ছিল সন্তানের কোনো

পিতৃ পরিচয়। এমন কী মানুষ তখন জানতই না যে নারী-পুরুষের এ দৈহিক মিলনের ফলে

নারীর গর্ভে সন্তান আসে। তারা সবাই এ সন্তানকে প্রকৃতির দান ভেবে গ্রহণ করেছে। কিন্তু

সভ্যতার ক্রমবিকাশে এ দৈহিক সম্পর্কের একটি নাম হয় এবং পরিবার প্রথার সূচনা হয়।

আর এ পরিবার গঠনের পূর্ব-শর্ত হচ্ছে বিয়ে, যা কিনা দু’জন নর-নারীকে একসঙ্গে আবদ্ধ

হয়ে জীবন-যাপনের নির্দেশ দেয়। নারী-পুরুষ এভাবে একসঙ্গে বসবাসের যে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ

হয় সেই সম্পর্কের নাম স্বামী-স্ত্রী। পিতৃতান্ত্রিক সমাজে পুরুষেরা এবং মাতৃতান্ত্রিক সমাজে

নারীরা পরিবারের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নেয়। পিতৃতান্ত্রিক সমাজে পুরুষ একটি পরিবারের

সর্বেসর্বা। মাতৃতান্ত্রিক সমাজেও নারীই পরিবারের সর্বেসর্বা। কিন্তু আমাদের সমাজে গুটি

কর্তৃক ক্ষুদ্র নৃ-গাষ্ঠী ব্যতীত মাতৃতান্ত্রিক পরিবারের দেখা পাওয়া যায় না বললেই চলে।

আমাদের দেশ পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় চলমান। তাই এ দেশের অধিকাংশ লেখক

সাহিত্যিকের রচনায় পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে দু একটি

ব্যতিক্রমী চিত্রও দেখা যায়। পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় নারীকে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বঞ্চনার

শিকার হতে দেখা যায়। এমন কি মধ্যযুগের সাহিত্যের প্রধান শাখা মঙ্গল কাব্যে ‘নারীর

পতি বিনে গতি নেই’ বলেও উল্লেখ রয়েছে।

বাঙলা সাহিত্যিকী

স্বামী বনিতার পতি স্বামী বনিতার গতি

স্বামী বনিতার সে বিধাতা।

স্বামী যে পরমধন স্বামী বিনে অন্যজন

কেহ নহে সুখ-মুক্ষ-দাতা ॥

নারী মানুষ হিসেবে তারা যে স্বকীয়তা নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছিল সেকথা তাদের মন থেকে মুছে

দেয় পুরুষতন্ত্র। এভাবে নারীর পুরুষের প্রতি নির্ভরশীলতা, নিজের জ্ঞান সম্পর্কে ও অধিকার

সম্পর্কে অজ্ঞতা নারীকে আস্তে আস্তে পুরুষের কাছে দুর্বল হতেও দুর্বলতর করে তুলেছে।

এভাবেই চলতে থাকা নর-নারীর সম্মিলিত দুষ্টু-মিষ্টি, মান-অভিমান আর খুনসুটির মধ্য দিয়ে

বয়ে চলা জীবনচিত্র তুলে ধরে সাহিত্য রচনা করেছেন সেলিনা হোসেন।

একজন নারী অনেক স্বপ্ন নিয়ে বিয়ে করে স্বামীর ঘরে আসে। একটা সুন্দর সংসার, সন্তান আর

সর্বোপরি স্বামীর ভালোবাসা এসব থাকে নারীর কল্পনার রাজ্য ঘিরে। স্বামীকে কাছে পাওয়াটা

নারীর সকল না পাওয়াকেও পূর্ণ করে দেয়। কিন্তু সেলিনা হোসেনের বৈশাখী গান ছোটগল্পে

ইকতি সেই হতভাগী নারী যার স্বামীকে কাছে পাওয়ার বাসনা বিয়ের মাত্র কিছুদিনেই মারা

যায়। বছরের ইদের দিনসহ মাত্র কয়েকটা দিন স্বামীকে কাছে পায় সে। ‘এই কটা দিন তৃপ্তি

হয় না ইকতির। তাই ভয়ানক রাগ।’

বছরের যে কয়টা দিন দু’জনের একসঙ্গে থাকা হয়,

সেই কটা দিন মান-অভিমানেই কেটে যায় সীমান আর ইকতির দাম্পত্য সম্পর্ক। সীমানও

যথেষ্ট সমঝদার স্বামী। স্ত্রীকে স্বামীসুখ দিতে না পারার ব্যর্থতার দায় মাথা পেতে নেয়।

যৌবনবতী স্ত্রীকে সর্বসুখ দিতে না পেরে তার যৌবন চাহিদাকেও সে অসম্মান করে না। তাইতো

মসজিদের ইমাম সাহেবের ছেলে সাজনের সঙ্গে ইকতির গোপন প্রণয়কে বেশ সহজ এবং

দায়িত্বের সঙ্গে গ্রহণ করে। ইকতির গর্ভে সাজনের সন্তান এলে গ্রামের লোক বিশেষ করে ইমাম

সাহেব যখন ইকতিকে অকথ্য অপমান করে এবং গ্রাম থেকে তাকে বের করে দিতে চায় তখন

সীমান এসে বটবৃক্ষ হয়ে ইকতিকে ছায়া প্রদান করে, গ্রামের সবার সামনে ইকতির সম্মানকে

সে উলঙ্গ হতে দেয়নি। ভরা সভায় সে স্ত্রীর পক্ষ হয়ে বলে উঠে, ‘আপনেরা হেরে ইয়ানে

আইনছেন কিয়ের লাই? হে যদি কোনো দোষ করে তার শাস্তি আঁই দিউম! আপনেরা কে?’

ইকতির মত আরেকটি স্বামী সোহাগ বঞ্চিত নারী কান্নার তৃতীয় দিন ছোটগল্পের জমিলা খাতুন

যে রঙিন স্বপ্নে বিভোর হয়ে স্বামীগৃহে এসেছিল তা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়েছিল হামিদ আলীর

কারণে। তবে ইকতির স্বামী ইকতিকে যথেষ্ট বুঝতো, শুধু সাধ্যের অভাবে কাছে রাখতে

পারেনি। ইকতিকে যতটুকু সম্ভব হয়েছে ভালবাসায় ভরিয়ে দিয়েছে তার স্বামী। কিন্তু জমিলা

খাতুনের স্বামী হামিদ আলী বিয়ের রাতেই তাকে বলে দিয়েছে ‘আমার সংসারের প্রয়োজনে

তোমাকে এনেছি। এর বেশি কিছু দাবি করো না’১১ শাস্ত্রে স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ককে সর্বাধিক মধুময়

বলা হলেও জমিলা খাতুন মধুময় জীবনের স্পর্শ পায়নি। ‘মন দেয়নি হামিদ আলী কোনোদিন

কিন্তু নিজের অংশটুকু কড়ায় গণ্ডায় বুঝে নিয়েছিলো।’ দাম্পত্য সম্পর্কে অতৃপ্ত জমিলা

খাতুনের তাই প্রাণবন্যার অধিকারী নতুন ভাড়াটে নব দম্পতির মধুময় দাম্পত্য সম্পর্ক দেখে

নিজের অতৃপ্তিগুলো আবার মাথাচড়া দিয়ে ওঠে। নিজে যে সুখ পায়নি, আজ পড়ন্ত যৌবনে

এসেও নব দম্পতির প্রেম মাখামাখিতে ঈর্ষান্বিত হয় এবং তাদের বাসা থেকে তাড়িয়ে দেয়ার

সিদ্ধান্ত নেয়। ‘অধিকাংশ লোকে স্ত্রীকে বিবাহমাত্র করে, পায় না, এবং জানেও না যে সে পায়

নর-নারী সম্পর্ক

নাই; তাহাদের স্ত্রীদের কাছেও আমৃত্যুকাল এ খবর ধরা পড়ে না।’ সেলিনা হোসেনের

রতিবিলাস ছোটগল্পের হাসিব খানও তার স্ত্রীকে মন্ত্রবলে মুসলিম সমাজের প্রথা অনুযায়ী শুধু

বিয়ে করেছে, তাকে পায়নি কখনো।

কতদিন রাতের অন্ধকারে হাসিব খান যখন উত্তেজিত হতো-মিসেস খানের ইচ্ছার বিরুদ্ধেও

যখন হারিয়ে যেতো যোনির এক সমুদ্র অন্ধকারের মাঝে তখন মিসেস খানের সমস্ত কাল্পনিক

বোধশক্তি আহত হতো-ক্ষুণ্ন হতেন তিনি। তার ভাবুক মন শতমুখে প্রশ্ন করতো

ভালোবাসাটি কি শুধু দৈহিক?

মিসেস খানের কাছে স্বামী-স্ত্রী সম্পর্কের মানে ছিল দুজনের বোঝা-পড়ার বিষয়। পুরুষের

একতরফা দেহ ভোগে তিনি বিশ্বাস করতেন না। হাসিব খানের উত্তেজিত মুহূর্তের অবসানে

তাকে প্রশ্ন করতেন “আমার দেহটার মূল্যই কি তোমার কাছে বড়ো? তুমি কি আমায় ভালবাসো

না? হাসিব খান হেসে ফেলতেন। আরো ঘন হয়ে বলতেন, ‘আমি তোমায় ভালোবাসি অস্থিমাংস

সহ’।” মিসেস খান এমন উত্তর আশা করেনি স্বামীর কাছে। এই পরিস্থিতিতে পুরুষতন্ত্রের

এই হীনবাসনাকে শুধু ঘৃণা করেছে মনে মনে। সেলিনা হোসেনের আদিম মানব প্রবৃত্তির ছোটগল্প

উৎস থেকে নিরন্তর ছোটগল্পে সুরত আলী তার স্ত্রীকে যার পর নাই ভালোবাসে। জেলে গিয়ে

স্ত্রী ওজুফার জন্য মন খারাপ হয়। মালিকের মদখোর ছেলেটা যে সর্বক্ষণ হা করে ওজুফার

যৌবনের পানে তাকিয়ে থাকে তার কথা ভেবে আতঙ্কে থাকে সার্বক্ষণ। জেল থেকে মুক্তি পেয়ে

স্ত্রীর কাছে এসে জানতে পারে জেলে বসে তার যে আতঙ্ক তাই সত্যি হলো। বদমায়েশটা তার

স্ত্রীর গর্ভে সন্তানের জন্ম দিল। এতে সুরত আলী প্রথমে রেগে স্ত্রীকে প্রহার করলেও বুঝতে পারে

যে এতে ওজুফার কোনো ভুল ছিল না। তাই মালিকের বখাটে ছেলেকে নিজ হাতে খুন করে।

কিন্তু সন্তানবৎসল সুরত আলী সেই বখাটের জন্ম দেয়া ছেলেকে শুধু স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসার

কারণে বুকে টেনে নেয়। বলে আমি ওকে মানুষ করবো ওজুফা। ও আমার ছেলে। তোর রক্ত আছে ওর গায়ে- ও তোর

ছেলে- ও মানুষের ছেলে। আমি আর কিছু জানতে চাই না- ও আমার, ও আমার- ও

আমার।

স্ত্রীর প্রতি স্বামীর ভালোবাসায় স্ত্রীর ওপর নির্যাতনের ফসলকেও স্বামী উদার দৃষ্টিতে গ্রহণ করে।

দাম্পত্য সম্পর্কের সবচেয়ে বড় বুনিয়াদ হলো বিশ্বাস আর ভালোবাসা। এক্ষেত্রে নারীবাদী

দৃষ্টিতে শুধু পুরুষের দোষটুকুই খোঁজা সেলিনা হোসেনের উদ্দেশ্য নয়। তিনি নিজে একজন

নারী হয়েও নারীর সত্য উপস্থাপন করেছেন। নারীবাদী মানে পুরুষ বিদ্বেষ নয় বরং নারী-পুরুষ

আলাদা নয় তাই তুলে ধরা। দোষে-গুণে পরিপূর্ণ হয় মানুষ; তা নারীই হোক বা পুরুষই হোক।

মৌসুমে ডিমের গন্ধ ছোটগল্পে মোতালেব ভালোবেসে তার বউকে ঘরে আনলেও বউ এর পক্ষ

থেকে সেই ভালোবাসাটা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। যে বউ ‘একদিনের অদর্শনে অস্থির হয়ে উঠতো’

অল্প কিছুদিন পর থেকেই বউ এর দুর্ব্যবহারে স্বামী মোতালেবের স্ত্রীর প্রতি ঘৃণা তৈরি হয়।

এমন কি পর নারীর প্রতি আকর্ষণও তৈরি হয়। দাম্পত্য সম্পর্কে এটা খুব স্বাভাবিক। কারণ

দাম্পত্য সম্পর্ক স্থায়ী হয় বিশ্বাস, ভালোবাসা আর আকর্ষণে। এর একটির ঘাটতিতে দাম্পত্য

জীবন হয়ে উঠে দুর্বিষহ।

পুরুষের অস্তিত্ব জুড়ে নারী লতার মত জড়িয়ে থেকেই পুরুষকে করেছে সার্থক। সমস্ত সম্পত্তির

মাঝে পুরুষ যখন সুখ খুঁজে পায় না তখন তার একমাত্র আরাধ্য হয় নারী। পুরুষের ভাষ্য হচ্ছে

‘আমি নারী চাই, ধান চাই, আগুন চাই।’১৮ স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের সূত্র ব্যাখ্যায় সেলিনা হোসেন

স্বতন্ত্র। তিনি তাঁর গল্পে নারী পুরুষকে বেঁধেছেন ভালোবাসায় আর বিশ্বাসের বন্ধনে। যেখানে

আর্থনীতিক বাঁধা তাদের মাঝখানে বিঘ্ন ঘটাতে পারেনি। স্রোত ছোটগল্পে ঐশ্বর্য আর

বিলাসিতায় বেড়ে ওঠা পারুল ভালোবেসে এক কাপড়ে ঘর ছাড়ে চুনুর সঙ্গে। দীন-দুখী চুনু

পারুলকে ঐশ্বর্য দূরের কথা মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করতে অক্ষম। কিন্তু পারুল যাকে

ভালোবেসেছে তাকে স্বামী হিসেবে পাওয়ার বাসনা করেছে এবং করেছেও তাই। অর্থকড়ির

অভাব থাকলেও চুনু আর পারুলের বাঁধা নীড়ে অভাব নেই সুখ-উচ্ছ্বাসের। ভালোবাসার শাসনে

দু’জন দু’জনকে নিয়ন্ত্রণ করে, খাইয়ে দেয় আরো কত রঙ্গলীলা। চুনু নিজের হাতে ভাত খেতে

না চাইলে পারুল বলে ‘আমি যহন আছিলাম না তহন ভাত খাও নাই?’ কিন্তু ভালোবাসার

কাঙ্গাল এবং স্ত্রীর প্রণয় প্রত্যাশী চুনু জবাব দেয় খাইছি। সেই খাওয়া আর এই খাওয়ার মধ্যে

অনেক তফাৎ। তহন খাইছিলাম প্যাটের তাগিদে, অহন খাই মনের তাগিদে। অহনকার ভাত

একদম আলাদা।’ এমন নিরবচ্ছিন্ন সুখ কাউকে আবার একঘেয়ে করে ফেলে। পানসে করে

দেয় অনেক স্বামী-স্ত্রীর জীবন। তাই কোনো কোনো স্বামী-স্ত্রী আবার ছোটো খাটো খুনসুটির

সূত্রপাত করে বেশ উপভোগ করে। তেমনি ‘মানুষটি’ ছোটগল্পে নিজের বৌকে টিপ্পনি কেটে

মজা পেতো মানুষটি [নাম উল্লেখ নেই]। সহজ সরল বৌকে টিপ্পনী কাটার মত কোনো ত্রুটি

খোঁজে না পেলেও তার কর্মস্থলের অধ্যক্ষের কক্ষে যাওয়াকে কেন্দ্র করে পানসে সুখের জীবনে

একটু টক-ঝাল ঘটনার সূত্রপাত করে ‘সেদিন শরিফ আলতাব [বউ যে কলেজে চাকরি করে

সে কলেজের অধ্যক্ষ] তোমাকে দুবার ডেকেছিল কেন? কেন তুমি আশি মিনিট তার ঘরে ছিলে?

প্রেমে পড়েছো নাকি?’ যদিও মানুষটি জানে যে তার স্ত্রীকে পুরুষ সংক্রান্ত ব্যাপারে সন্দেহ

করা যায় না। তথাপিও এমন প্রশ্ন কেবলই তার একঘেয়েমি দূর করার জন্য। সেলিনা হোসেন

স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের সূত্র ব্যাখ্যায় সজাগ থেকেছেন সর্বত্র। নিরেট সুখ কীভাবে কারো জীবনকে

পানসে করে দেয় তা লক্ষ করেছেন তাঁর জীবন দৃষ্টি দিয়ে। সেই মানুষটিকে কখনো কখনো

মা এবং স্ত্রীর ঝগড়ার মাঝখানে বিড়ম্বিত হতে হয়েছে। গুরুত্বের বিচারে মানুষটি স্ত্রী এবং মায়ের

মধ্য থেকে কাউকে ছোট ভাবতে পারেনি; তাই কারো পক্ষ তার নেয়া হয় না বলে নীরবে ঘর

থেকে বেরিয়ে গিয়ে বেঁচে যায়।

কখনো নারী হৃদয়া নারী একজন পুরুষের প্রণয়ে ভুলে যায় সব ব্যবধান। পুরুষের বাহুডোরে

নিজেকে বাঁধতে চেয়েছে সমগ্র নারী সত্তা দিয়ে। দ্বিগুণেরও বেশি বয়সের পুরুষ আবদেলকে

ভালোবেসে বিয়ে করে আছিয়া। তার ছোটো বোন পাত্রের বয়স নিয়ে কথা বললে সে বলে

‘বয়সের হেরফেরে কি আসে যায়? মানুষের হৃদয়ই সব।’ শুধু চেয়েছিল ভালোবেসে সকল

ব্যবধান ভুলে থাকবে। কিন্তু দাম্পত্য জীবনে প্রবেশ করেই আছিয়ার স্বপ্ন ভেঙ্গে চুরমার হয়।

আবদেল মানুষ হিসেবে ভালো হলেও স্বামী হিসেবে ভালো হয়ে উঠতে পারেনি। তবে আছিয়ার

প্রতি সমস্ত দায়িত্ব সে যথাযথ পালন করে, তার কোনো অভাব রাখেনি, কিন্তু আছিয়া এসব

চায়নি। আছিয়া চেয়েছে আবদেল পৌরুষত্ব দিয়ে তাকে তুষ্ট করুক।

আবদেল ওকে যত্ন করে। হাট থেকে ভালো মাছ তরকারি কিনে আনে। তেল, সাবান ডুরে

শাড়ি এনে দেয়। আছিয়ার ভালো লাগে না। ও আবদেলের কাছে আরো আবেগ চায়। সে

আবেগ ওর নতুন যৌবনের জন্য প্রয়োজন। কিন্তু আবদেল এসব বোঝে না। বোঝে পাঙ্গাস

মাছ আর সুবাসিত তেলই বুঝি আছিয়ার জন্য জরুরি।

এমন অনাকাঙ্ক্ষিত সম্পর্কের জাল ছিন্ন করে আছিয়ার বৈধব্য বাণীকে সত্যি করে বিয়ের মাত্র

দেড় বছর পর আবদেল যখন মারা যায় তখন আছিয়ার এই বৈধব্য প্রাপ্তিতে কোনো দুঃখ

অনুভূত হয় না। ‘বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় যে এই বৈধব্যের জন্য আছিয়ার কোনো দুঃখ নেই।’

আছিয়ার আরেকরূপ দেখতে পাই আমরা লিপিকার বিয়ে এবং অতঃপর ছোটগল্পে লিপিকা

চরিত্রের মধ্যে। তবে আছিয়ার মত লিপিকাকে বৈধব্য বরণ করতে না হলেও এমন দাম্পত্য

জীবনও তার কাম্য নয়। যেখানে স্বামী আফসার আহমদ বাসর ঘরেই নিজের সিদ্ধান্তের কথায়

জানিয়ে দেয় লিপিকাকে। সে জানায় সংসারে কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়ার ব্যাপারে

লিপিকার কোনো অধিকার থাকবে না। এমন কি সন্তান ধারণের ক্ষেত্রেও সে যা চায় তাই হবে।

আফসার আর লিপিকার দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড অস্বাভাবিক হয়ে ওঠেনি স্বামী

আফসারের পুরুষালি আক্রমণাত্বক মনোভাবের কারণে। যে উদরে সন্তান ধারণ হবে সে উদরের

মালিকের কোনো কিছু বলার অধিকার নেই। সমালোচক যথার্থই বলেছেন, ‘সৃষ্টির রহস্য খুঁজলে

আরেকবার নতুন করে প্রমাণিত হবে, পুরুষ স্বার্থপর ও নারী কল্যাণময়ী, নিঃস্বার্থপ্রাণ।’

সামাজিক সকল কর্মকাণ্ড এমন কি সন্তান ধারণের ক্ষেত্রেও পুরুষ স্বার্থপরতার পরিচয় দিয়ে

থাকে। এ ব্যাপারে পূরবী বসু প্রাণীকূলের কিছু স্বার্থপরতার চিত্র তুলে ধরেছেন।

মাছির কথাই ধরা যাক। পুরুষ ও মেয়ে মাছি একবার সঙ্গমে লিপ্ত হওয়ার পর মেয়ে মাছি

তার শরীরের গুপ্ত পকেটে প্রায় পাঁচশো শুক্রানু জমা করে রাখতে পারে। যতক্ষণ না মিলনের

জন্যে তার নিজস্ব ডিম্বকোষ তৈরি হচ্ছে, সে এই শুক্রাণুগুলো ধরে রাখতে পারে। তবে

পরবর্তী সঙ্গমে প্রাপ্ত শুক্রানু অনায়াসে আগেরগুলোর জায়গা দখল করে নিতে পারে। সেটা

পুরুষ মাছি ভালো করেই জানে। আর তাই নিজের জিন রক্ষা ও তার পবিত্রতার নিশ্চয়তা

দান করতে পুরুষ মাছি তার বীর্যের সঙ্গে প্রায় ষাট রকম প্রোটিন ঢেলে দেয় মেয়ে মাছির

শরীরে। প্রথমত এগুলো তার বীর্যকণাকে খাদ্য ও শক্তি জোগায় নিষেক ক্রিয়ার সফলতা

নিশ্চিত করার জন্যে।

দ্বিতীয়ত, এ প্রোটিনগুলো মেয়ে-মাছিটির যৌনাকাঙ্ক্ষাকে দাবিয়ে রাখে, যাতে সে অন্য পুরুষ

মাছির সঙ্গে মিলিত হতে আগ্রহী না হয়। … একই জিনিস ঘটে এক ধরনের বন্য বিড়ালের

মধ্যেও। সঙ্গমের পর পুরুষ বিড়ালটি সার্বক্ষণিকভাবে পাহারা দিয়ে রাখে স্ত্রী বিড়ালটিকে যতক্ষণ পর্যন্ত মেয়ে-বিড়ালটি যৌনতাড়িত থাকে। এই পাহারা দেওয়ার একটাই উদ্দেশ্য।

মেয়ে বিড়ালটি যাতে অন্য কোনো পুরুষ বিড়ালের সঙ্গে মিলিত হতে না পারে এবং তার

শুক্রাণুদিয়েই নিশ্চিতভাবে যাতে জন্ম নেয় শিশু বিড়াল।

মনুষ্যকূলের পুরুষদের মধ্যেও বরাবরই মাছি এবং বিড়ালের মতো নারীর উদরে দখলদারিত্ব

ছিল। তারা নিজেদের স্বার্থে নারীর উদর দখল নিত। বিয়ের প্রথম রাতেই আফসার ও লিপিকার

যে সম্পর্কতৈরি হয়নি তা প্রতি মুহূর্তেই শুধু দূরত্ব তৈরি হয়েছে। আফসার লিপিকার পানে

দু’পা এগিয়ে এসে বলে-

শোবে না?

-হ্যাঁ, শোবো তো। ইয়ে মানে তুমি রেডি তো?

– রেডি? ঠিক বুঝতে পারলাম না তোমার কথা?

-আমি কিন্তু তাড়াতাড়ি মা হতে চাই না।

-লিপিকা?

আফসার চেঁচিয়ে উঠে।

-এসব কী বলছো?

-কেন বলবো না? বিষয়টা দুজনের ইচ্ছে-অনিচ্ছের ব্যাপার।

-না, আমার একার।

আফসার সঙ্গে সঙ্গে জেদের সঙ্গে বলে।

অথচ, পারিবারিক ব্যবস্থাবলিকে ইসলামি ধাচে পরিচালনার জন্য যে তিনটি বুনিয়াদের কথা

বলা হয়েছে তার মধ্যে ‘পারস্পরিক পরামর্শ’ অন্যতম। বাসরঘরে আফসার এবং লিপিকার

কথামালায় সেই পারস্পরিক পরামর্শটুকুর ঘাটতি দেখা যায়। এরকম দাম্পত্য জীবনে অতিষ্ঠ

লিপিকার জীবন কুকড়ে যাচ্ছে প্রতিমুহূর্তে। শুধু নারী নয় স্বামী-স্ত্রী সম্পর্কে অনেক সময়

পুরুষকেও এই যন্ত্রণার বোঝা বয়ে বেড়াতে হয়। অন্তঃসারশূন্য একটা লোক দেখানো সম্পর্কের

বোঝা ভেতরে নিঃশেষ করে দেয় দুর্নীতি ছোটগল্পের নিয়ামত রসুলের জীবন। বাবা মায়ের

পছন্দে বিয়ে করলেও বিয়ের অল্পকাল পরেই রসুলের আদর্শে প্রতিঘাত হয় তার স্ত্রী আফরোজার

দ্বারা। সৎ পুলিশ অফিসার দেখে নয়, আফরোজা নিয়ামতকে বিয়ে করে শুধু উপরি পাওনার

সুযোগ আছে বলে; এ অভিমত এক নিমেষে নিয়ামতের সংসার করার স্বপ্নকে ধুলিস্যাৎ করে

দেয়। প্রাণে যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে বাবা মায়ের আদর্শ বুকে লালন করে বড় হয় এবং বিয়ের স্বপ্ন

দেখে সেই স্বপ্ন তার জীবনে হানা দেয় আদর্শচ্যুতির আশঙ্কা হয়ে। কিন্তু নিয়ামতের আদর্শে

বিচ্যূতি ঘটার নয়- তাই সংসার তার শেকড় বিস্তার করে না। আফরোজা মা হওয়ার বাসনা

ব্যক্ত করলেও যে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মাঝে দুর্নীতি আছে সেই সম্পর্কের সূত্র ধরে আর কারো

আগমন নিয়ামত প্রত্যাশা করে না।

স্বামী-স্ত্রী একটি পবিত্র সামাজিক সম্পর্কের নাম। তবে এ সম্পর্ক কোনো সূত্রবলে প্রাপ্য নয়, এ

সম্পর্ক অর্জনের। শুধু বৈবাহিক আনুষ্ঠানিকতায় এ সম্পর্কের মধুর রস আহরিত হয় না। ভিন্ন

এবং স্বতন্ত্রধারার দুটি মানুষ এক হয়ে তাদের চিন্তা চেতনা এবং কর্মক্ষেত্রে একাত্মতা অনুভবের

নামই স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ক। শুধু বিয়েই স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ক তৈরির প্রধান শর্ত নয়, তবে প্রথম শর্ত।

এখানে একজন আরেকজনে পাওয়ার ব্যাপার থাকে। এ পাওয়া দুজনের প্রতি দুজনের দায়িত্ব,

কর্তব্য এবং বোঝাপড়ার উপর নির্ভর করে। অনেক স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার সম্পর্কে অর্থনীতিক প্রশ্ন

জড়িয়ে পড়ে। অথবা, তাদের সম্পর্কের অর্থাৎ দায়িত্বের অনুষঙ্গ অর্থ দ্বারা পরিমাপ হয়, সেসব

ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রী বিয়ে করে প্রায়শ্চিত্ত করছেন বলে মনে করেন। জীবনের সমস্ত ভুলের খেসারত

মনে করেন একে অপরকে। দাম্পত্য সম্পর্ক তখন দুর্বিষহ হয়ে পড়ে। কিন্তু সেলিনা হোসেন

তাঁর সিজ ফায়ার ছোটগল্পে দেখিয়েছেন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে একাত্মতা অর্জনের জন্য দুজনের

বিবেচনা এবং অনুভূতিশীল হৃদয়ই যথেষ্ট।

সর্বশেষ

এই বিভাগের আরও